
সংসারের অভাব ঘোচাতে ঋণ করে দেড় বছর আগে মালদ্বীপে পাড়ি জমিয়েছিলেন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ৫৪ বছর বয়সী আবদুল জলিল। স্বপ্ন ছিল প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে ঋণ শোধ করবেন, স্ত্রী-সন্তানের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস মালদ্বীপে যাওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় তার বৈধ কাগজপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এরপর কাজের অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব ও ঋণের চাপের মধ্যেই কাটছিল তার দিন। শেষ পর্যন্ত সেই প্রবাসজীবনের করুণ পরিণতি হলো ঘুমের মধ্যেই।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাতে মালদ্বীপের রাজধানী মালের একটি ভাড়া বাসায় ঘুমের মধ্যে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা যান আবদুল জলিল। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মালেতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন।
নিহত আবদুল জলিল কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবার নাম আব্দুল গাফুর। দেশে তার স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান রয়েছে।
স্বজনরা জানান, পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে ধারদেনা করে প্রায় দেড় বছর আগে মালদ্বীপে যান জলিল। সেখানে প্রথম তিন মাস বৈধভাবে কাজ করেন। পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি বৈধতা হারান।
এরপর থেকেই নিয়মিত কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো কাজ মিললেও তা ছিল অনিশ্চিত। অন্যদিকে দেশে রেখে যাওয়া বড় অঙ্কের ঋণের চাপ তাকে সবসময় দুশ্চিন্তায় রাখত।
জলিলের চাচাতো শ্যালক প্রবাসী মো. জাকির বলেন, বৈধতা হারানোর পর জলিলকে প্রায়ই বেকার থাকতে হতো। দেশে বড় অঙ্কের ঋণ রেখে আসায় কাজ না থাকলে তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়তেন। এসব কারণে তিনি মানসিকভাবেও অনেকটা ভেঙে পড়েছিলেন বলে জানান স্বজনরা।
ঘটনার রাতে অন্যান্য দিনের মতো খাবার খেয়ে ঘুমাতে যান আবদুল জলিল। মাঝরাতে তার রুমমেট তাকে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে তাকে উদ্ধার করে ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জলিলের ভাই আবদুর রহমান বলেন, তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে রেখে জলিলের এমন মৃত্যুতে তারা অসহায় হয়ে পড়েছেন।
তিনি দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।
এদিকে আবদুল জলিলের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে মালদ্বীপে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে হাইকমিশন।
পরিবারের আর্থিক অনটন ঘোচাতে বিদেশে গিয়ে বৈধতা হারানো, কাজের অনিশ্চয়তা ও ঋণের চাপে থাকা আবদুল জলিলের আকস্মিক মৃত্যু আবারও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপদ, বৈধ ও নিশ্চিন্ত কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে এসেছে।
মন্তব্য করুন